শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।

মহামারি প্রতিরোধে হজরত ওমরের সিদ্ধান্তই ছিল যুগোপযোগী

মহামারি প্রতিরোধে হজরত ওমরের সিদ্ধান্তই ছিল যুগোপযোগী


৬৩৯ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ১৮ হিজরির ঘটনা। হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন ইসলামি খেলাফতের আমির। সে সময় সিরিয়া-প্যালেস্টাইনে দেখা দেয় মহামারি প্লেগ। খলিফা ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে জানতে পারেন সিরিয়ায় মহামারি প্লেগ দেখা দিয়েছে। তাতে তিনি তাঁর সিরিয়া সফর স্থগিত করেছিলেন। মহামারি প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষায় তা ছিল হজরত ওমরের সময়ের সেরা কার্যকরী সিদ্ধান্ত।


ইসলামি খেলাফতের প্রথম যুগে হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে সিরিয়ায় মহামারি প্লেগ দেখা দেয়। সে সময় হজরত ওমর ছিলেন প্রায় অর্ধ জাহানের খলিফা। সে সময় সিরিয়া-প্যালেস্টাইনে ছিল হজরত ওমরের রাষ্ট্রীয় সফর।

সফরের উদ্দেশ্যে তিনি মদিনা থেকে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে যান। মদিনা থেকে ‘সারগ’ নামক অঞ্চলে পৌছলে সেনাপতি আবু উবায়দাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু জানান যে, সিরিয়ায় প্লেগ তথা মহামারীর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। তিনি ইসলামে ইতিহাস এ ঘটনা তাউন আম্মাউস (طاعون عمواس) নামে পরিচিত। সে সময় তিনি সফর স্থগিত করেছিলেন। মুসলিম উম্মাহর জন্য তা ছিল অনেক বড় শিক্ষানীয় বিষয়।

হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সে ঘটনায় রয়েছে করোনা প্রতিরোধ ও প্রতিকারে রয়েছে উদ্দীপনা। আর তা তুলে ধরা হলো-

সিরিয়া মহামারি প্লেগ-এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ায় হজরত ওমর প্রবীণ সাহাবাদের কাছে এ মর্মে পরামর্শ চান যে, তিনি সিরিয়া সফর করবেন নাকি মদিনায় ফিরে যাবেন? সাহাবাদের মধ্য থেকে দুইটি মতামত জানানো হয়-

হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাষ্ট্রীয় সফরে মহামারী প্লেগ আক্রান্ত অঞ্চলে যাবেন নাকি মদিনায় ফিরে যাবেন এ নিয়ে ৩টি পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়-

প্রথমটি ছিল : প্রবীণ সাহাবাদের পরামর্শ

কিছু সাহাবা মতামত দিলেন যে, আপনি যে উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন, সে উদ্দেশে সফর অব্যাহত রাখেন। অর্থাৎ সিরিয়ায় যাওয়ার পক্ষে মত দেন। আবার কিছু সাহাবা বললেন, ‘খলিফার সিরিয়া যাওয়া উচিত হবে না।

দ্বিতীয় ছিল : আনসার ও মুহাজিরদের পরামর্শ সভা

হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রবীণ সাহাবাদের কাছ থেকে দুইটি মতামত পাওয়ায় পুনরায় পরামর্শের জন্য আনসার ও মুহাজির সাহাবাদের ডাকলেন। তারাও মতপার্থক্য করলেন।

সবশেষে ছিল : প্রবীন কুরাইশদের পরামর্শ সভা

খলিফা ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সবশেষে প্রবীণ কুরাইশদের ডাকলেন। তারা কোনো মতানৈক্য না করে সবাই এ মর্মে মতামত ব্যক্ত করলেন যে-

‘সিরিয়ার সফর স্থগিত করে আপনার মদিনায় প্রত্যাবর্তন করা উচিত। আপনি আপনার সঙ্গীদের মহামারী প্লেগের দিকে ঠেলে দেবেন না।’

হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রবীণ কুরাইশদের মতামত গ্রহণ করে সিরিয়ার সফর স্থগিত করে মদিনায় ফিরে গেলেন।

খলিফার মদিনায় ফেরত যাওয়া দেখে সেনাপতি হজরত উবায়দাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনিন! আপনি কি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তাকদির থেকে পলায়ন করে ফিরে যাচ্ছেন?’

সেনাপতি হজরত আবু উবাইদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছ থেকে এ কথা শুনে হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কষ্ট পেলেন। প্রিয় মানুষের কাছে যেভাবে আপনজন কষ্ট পায়। কেননা হজরত আবু উবায়দাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন খলিফার অনেক পছন্দ ও ভালোবাসা পাত্র। তাছাড়া সেনাপতি আবু উবায়দাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবাদের অন্যতম একজন।


তখন হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘হে আবু উবায়দাহ! এ কথাটি তুমি না বলে যদি অন্য কেউ বলতো! তিনি সেনাপতির কথার উত্তরে বললেন- ‘হ্যাঁ’, আমরা আল্লাহর এক তাকদির থেকে আরেক তাকদিরের দিকে ফিরে যাচ্ছি।’ হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সেনাপতি আবু উবায়দাহকে এ কথা বুঝাতে একটি উদাহরণ তুলে ধরেন এবং বললেন-

‘তুমি বলতো, তোমার কিছু উটকে তুমি এমন কোনো উপত্যকায় নিয়ে গেলে যেখানে দুইটি মাঠ আছে। মাঠ দুইটির মধ্যে একটি মাঠ সবুজ শ্যামলে ভরপুর। আর অন্য মাঠটি একেবারে শুষ্ক ও ধূসর। এখানে উট চরানো নিয়ে বিষয়টি কি এমন নয় যে, ‘তুমি সবুজ-শ্যামল মাঠে উট চরাও। আর তা আল্লাহর নির্ধারিত তাকদির অনুযায়ীই চরিয়েছ। আর যদি শুষ্ক মাঠে চরাও, তা-ও আল্লাহর তাকদির অনুযায়ী চরিয়েছ।

এ উপমায় হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সেনাপতিকে এ কথাই বলতে চাচ্ছেন যে, হাতে সুযোগ থাকতে ভালো গ্রহণ করার মানে এই নয় যে, আল্লাহর তাকদির থেকে পালিয়ে যাওয়া।’
সে সময় হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি হাদিস বর্ণনা করেন। সে হাদিসের বর্ণনায় হজরত আবু উবায়দাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর জিজ্ঞাসার পরিপূর্ণ সমাধান ওঠে আসেছে।

হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিস শোনালেন। আর তাহলো- ‘তোমরা যখন কোনো এলাকায় মহামারী প্লেগের বিস্তারের কথা শুনো, তখন সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি কোনো এলাকায় এর প্রাদুর্ভাব নেমে আসে, আর তোমরা সেখানে থাকো, তাহলে সেখান থেকে বেরিয়েও যেও না।’ (বুখারি)

হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর মাহামারী আক্রান্ত অঞ্চলে যাওয়ার সমাধান যেভাবে এ হাদিসের মাধ্যমে এসেছিল। এ হাদিসের ওপর যথাযথ আমলই বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে করোনাসহ সব সংক্রামক মহামারী রোগ-ব্যাধিতে হাদিসের ওপর আমল ও সতর্ক থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Leave a Reply

Close Menu