সারা বিশ্ব যখন করোনায় আক্রান্ত তখন আলেমদের ফতুয়া

সারা বিশ্বের মানুষ যখন করোনাভাইরাসে আতঙ্কিত, এই রোগের সংক্রামক থেকে যখন দেশে দেশে লক ডাউন হচ্ছে, কোথাও কোথাও কারফিউ দিচ্ছে কেউ কেউ স্বেচ্ছায় গৃহে অবস্থান করছে ঠিক এমনই সময় কিছু সংখ্যক ধর্মান্ধরা হাদিসের দোহাই দিচ্ছেঃ তাদের মতে, ইসলামে সংক্রমণ রোগ বলে কিছু নেই।
মসজিদে নামাজ বন্ধ করা যাবে না। তারা যে হাদিসটির রেফারেন্স দিচ্ছে তাহল আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, নবী সা. বলেছেন, “রোগ সংক্রমণ, কুলক্ষণ, পেঁচা এবং সফর মাস বলতে কিছু নাই।” (সহীহু বুখারী, হা/৫৭০৭)।
কিন্তু তারা যে অজান্তেই ভুল ব্যাখা করে মানুষকে বিপদের মুখে ফেলে দিচ্ছে। মনে রাখতে হবে হাদিস এবং কোরআনের আয়াত বিভিন্ন ঘটনা, অবস্থা আর পরিস্থিত অনুযায়ী নাজিল হয়েছে। যেমন উদাহরণ হিসাবে মদ সম্পর্কিত আয়াত সমূহের কথা ধরা যাক। কুরআনে যা পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সময়ে একাধিক সুরায় একাধিক আয়াত নাজিলের মাধ্যমে পরিপূর্ণতা পেয়েছে। প্রথমে সূরা বাকারার-২১৯ নাম্বর আয়াতে মদ সম্পর্কে তথ্য দেয়া হয়;
আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেনঃ
“۞ يَسْـَٔلُونَكَ عَنِ ٱلْخَمْرِ وَٱلْمَيْسِرِ ۖ قُلْ فِيهِمَآ إِثْمٌۭ كَبِيرٌۭ وَمَنَـٰفِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَآ أَكْبَرُ مِن نَّفْعِهِمَا ۗ وَيَسْـَٔلُونَكَ مَاذَا يُنفِقُونَ قُلِ ٱلْعَفْوَ ۗ كَذَ‌ٰلِكَ يُبَيِّنُ ٱللَّهُ لَكُمُ ٱلْءَايَـٰتِ لَعَلَّكُمْ تَتَفَكَّرُونَ [٢:٢١٩] ”
“তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্যে উপকারিতাও রয়েছে, তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড়। আর তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে, কি তারা ব্যয় করবে? বলে দাও, নিজেদের প্রয়োজনীয় ব্যয়ের পর যা বাঁচে তাই খরচ করবে। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্যে নির্দেশ সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা চিন্তা করতে পার। সূরা বাক্বারাঃ ২১৯

পরে সূরা নিসার-৪৩ নম্বর আয়াতে স্বল্প মাত্রায় নিষিদ্ধ করা হয়।
আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেনঃ
“يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تَقْرَبُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ وَأَنتُمْ سُكَـٰرَىٰ حَتَّىٰ تَعْلَمُوا۟ مَا تَقُولُونَ وَلَا جُنُبًا إِلَّا عَابِرِى سَبِيلٍ حَتَّىٰ تَغْتَسِلُوا۟ ۚ وَإِن كُنتُم مَّرْضَىٰٓ أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ أَوْ جَآءَ أَحَدٌۭ مِّنكُم مِّنَ ٱلْغَآئِطِ أَوْ لَـٰمَسْتُمُ ٱلنِّسَآءَ فَلَمْ تَجِدُوا۟ مَآءًۭ فَتَيَمَّمُوا۟ صَعِيدًۭا طَيِّبًۭا فَٱمْسَحُوا۟ بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَفُوًّا غَفُورًا [٤:٤٣] ”
হে ঈমাণদারগণ! তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাক, তখন নামাযের ধারে-কাছেও যেওনা, যতক্ষণ না বুঝতে সক্ষম হও যা কিছু তোমরা বলছ, আর (নামাযের কাছে যেও না) ফরয গোসলের আবস্থায়ও যতক্ষণ না গোসল করে নাও। কিন্তু মুসাফির অবস্থার কথা স্বতন্ত্র আর যদি তোমরা অসুস্থ হয়ে থাক কিংবা সফরে থাক অথবা তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি প্রস্রাব-পায়খানা থেকে এসে থাকে কিংবা নারী গমন করে থাকে, কিন্তু পরে যদি পানিপ্রাপ্তি সম্ভব না হয়, তবে পাক-পবিত্র মাটির দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও-তাতে মুখমন্ডল ও হাতকে ঘষে নাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা ক্ষমাশীল।

সবশেষে সূরা মাইদার-৯০নম্বর আয়াতে এসে তা পরিপূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ বা হারাম করে দেয়া হয়। আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেনঃ
“يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ إِنَّمَا ٱلْخَمْرُ وَٱلْمَيْسِرُ وَٱلْأَنصَابُ وَٱلْأَزْلَـٰمُ رِجْسٌۭ مِّنْ عَمَلِ ٱلشَّيْطَـٰنِ فَٱجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ [٥:٩٠] ”
“হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ তো নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক-যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও।”
এখানে “ফাজতানিবুহু” শব্দ ব্যবহার করা হয়, যার অর্থ আরবী ভাষায় সর্বোচ্চ মাত্রায় নিষিদ্ধকরণ বুঝায়। তাই যদি কেউ মদ সম্পর্কে জানতে শুধু মাত্র সূরা বাকারা কিংবা নিসার আয়াত তুলে ধরেন, তবে সেখানে ভুল হয়ে যাবার সম্ভবনা থেকে যায়। তেমনি উল্লেখিত হাদিসটি কেউ কেউ ভুল বুঝে থাকেন। তারা মনে করেন, এই হাদিসে ছোঁয়াচে রোগকে অস্বীকার করা হয়েছে। আসলে বিষয়টি তেমন নয়। জাহেলী যুগে পেঁচার ডাক এবং সফর মাসকে কুলক্ষণে মনে করা হত পাশাপাশি তারা এও বিশ্বাস করতো যে কোন কোন ব্যাধিকে নিজে নিজেই সংক্রমিত হয়। তাদের এই কুসংস্কার ও ভ্রান্ত বিশ্বাসকে দূরীকরণের জন্য এবং এই হাদিসটি বর্নিত হয়েছিল। এবার আমরা জেনে নেই ইসলামে যে ছোয়াচে রোগ থেকে দূরে থাকতে বলেছ তার কয়েকটি হাদিসের উদাহরণ যেমন “কুষ্ঠ রোগী থেকে দূরে থাক, যেভাবে তুমি সিংহ থেকে দূরে থাক”। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৭০৭।

আরেকটি হাদিসে এসেছে ‘যদি তোমরা শুনতে পাও যে, কোনো জনপদে প্লেগ বা অনুরূপ মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে তবে তোমরা তথায় গমন করবে না। আর যদি তোমরা যে জনপদে অবস্থান করছ তথায় তার প্রাদুর্ভাব ঘটে তবে তোমরা সেখান থেকে বের হবে না। (বুখারী, আস-সহীহ ৫/২১৬৩; মুসলিম, আস-সহীহ ৪/১৭৩৮, ১৭৩৯)

সুস্থ উট অসুস্থ উটের সাথে থাকলে রোগাক্রান্ত হতে পারে তাই হাদিসে এসেছে আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন: “অসুস্থ উটগুলোর মালিক তার উটগুলোকে সুস্থ পশুর দলে পাঠিয়ে দেবে না।” সহীহ মুসলিম

এখন যারা বলেন ইসলামে ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই তাদের কাছে প্রশ্ন তাহলে কেন কুষ্ঠ, প্লেগ রোগীদের কাছ থেকে দূরে থাকবার নির্দেশ রাসুল সা. আমাদের দিয়েছিলেন। আজ আমরা যে, কোয়ারেন্টিনে সংক্রমন প্রতিরোধে বিচ্ছিন্নকরণ ব্যবস্থার নির্দেশনা প্রদান করছি রাসুল সা. তা দেড় হাজার বছর পূর্বেই বলে গেছেন। এই করোনা ভাইরাস থেকে পরিত্রাণের উপায় কি?

আমি মনে করি করোনা ভাইরাস একটি উচ্চ বংশীয় সম্মাণিত একটি ভাইরাস। তিনি নিজের সম্মান রক্ষার্থে নিজ থেকে কারো উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন না যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ তার সংস্পর্শে না আসে। তাই বুদ্ধিমানে কাজ হলো তার কাছ থেকে নিজেকে দূরে রাখা। আর তা করতে হলে স্বেচ্ছায় গৃহবাস নিতে হবে নিজেকে আবদ্ধ করতে হবে গৃহে। যেমনটা বিশেষজ্ঞরা বলছেন। সুরা বাকারার ১৫৩ নাম্বার আয়াত অনুসরণ করতে হবে “হে মুমিন গন! তোমরা ধৈর্য্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চিতই আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে রয়েছেন”। আর যখনই নামাজ পড়তে যাবেন তখনই অনুসরণ করতে হবে সুরা মায়দার ৬ নাম্বার হয় “হে মুমিন গন! যখন তোমরা নামাযের জন্যে উঠ, তখন স্বীয় মুখমন্ডল ও হস্তসমূহ কনুই পর্যন্ত ধৌত কর এবং পদযুগল গিটসহ। যদি তোমরা অপবিত্র হও তবে সারা দেহ পবিত্র করে নাও”। অর্থাৎ নিজেকে পরিস্কার রাখা যা বলা হচ্ছে বারবার সাবান দিয়ে হাত ধুবেন। বেশি বেশি করে তওবা করা “যারা তাওবা করে নিজেদের সংশোধন করে নেয় এবং সত্য কথা প্রকাশ করে আমি তাদেরকে ক্ষমা করি; আমি যে অত্যন্ত ক্ষমা প্রিয় অতীব দয়ালু।’ (সুরা বাক্বারা : আয়াত ১৬০)

Leave a Reply